Thursday , 26 April 2018

সংবাদ শিরোনাম

অতি সাধারণ এক সাংবাদিকের কথা-১

December 7, 2016 10:45 pm Leave a comment A+ / A-

13124735_1711101535834908_8819454241842301693_nপ্রকৃত অর্থে সাংবাদিক হতে পেরেছি কিনা জানি না, তবে ১৯৮০ সাল থেকে এ পেশায় আছি বিভিন্ন মাত্রায়। যাত্রা শুরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাস্ট ইয়ারে থাকাকালে। মাধ্যম শ্রদ্ধেয় বুলু ভাই, চার পৃষ্ঠার সাপ্তাহিক জনকথা দিয়ে। জনকথায় সংযুক্ত হবার সুযোগ পাবার আগে গিয়েছিলাম সাপ্তাহিক মতামত-এ।
সংবাদিকতায় আসার পিছনে অনুঘটক হিসেবে কয়েকটি বিষয় কাজ করেছে। এক. বরিশাল কলেজে পড়াকালে এক সহপাঠিনীর প্রতি প্রেম জাতীয় অনুরাগ। দুই. বুলু ভাই, মানে রেজা রায়হান। তিন. বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের রাজনীতির বিভ্রান্তি দ্রুত কেটে যাওয়া।
স্কুল জীবনে সুশীল ছাত্র ইউনিয়ন, কলেজ জীবনে কিলিয়ে কাঠাল পাকাবার মতো বৈজ্ঞানী সমাজতন্ত্র কায়েমের অবাস্তব দোলাচল। রাজনীতির চক্করে বিএম কলেজ, হাতেম আলী কলেজ হয়ে বিজ্ঞান শাখা ছেড়ে লেখা পড়া চাঙ্গে ওঠার মতো অবস্থায় তখন আমি বরিশাল কলেজের মানবিক শাখার ছাত্র। সে সময় বরিশাল শহরে আর কোন কলেজ ছিলো না ছেলেদের ভর্তি হবার মতো। সে সময় আমি যত না ছাত্র, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনীতির কর্মী। রাজনীতির চাপ সত্ত্বেও প্রাণীকুলের সহজাত আবেগ কিছুটা হলেও ছিলো। ফলে এক সহপাঠিনীকে বেশ ভালো লেগেছিলো। প্রেমের উদ্রেক হওয়া যাকে বলে। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো, তাকে বলি কী ভাবে!
একে তো প্রেম নিবেদন করার জন্য সাহসের যথেষ্ট ঘাটতি; তার উপর বিষয়টি জানাজানি হলে কি পরিস্থিতি দাঁড়ায় সে নিয়েও ছিলো শংকা। আমাদের সময় চিঠি ছিলো প্রেম নিবেদনের প্রধান মাধ্যম। আমিও এর আশ্রয় নিতে পারতাম। কিন্তু চিঠি যদি বেহাত হয়, অথবা হয় প্রত্যাখাত; রাগে যদি ছুঁড়ে ফেলে দেয়! তা হলে তো ছাত্র নেতার প্রেমের কাহন চাউড় হয়ে আর মুখ দেখাবার উপায় থাকবে না।
সে সময় ১৯৭৭ সালে আমি বরিশাল জেলা জাসদ ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক। তিমি দা (তিমির লাল দত্ত, ২৩ অক্টোবর না ফেরার দেশে চলে গেছেন), জিন্না ভাই, সাইফুল ভাই, মাহবুব ভাই অধিকতর গুরুত্বপূর্ন নেতা। পান্না ভাই (জেড আই খান পান্না) ছিলেন আমাদের তাত্ত্বিক নেতা, বরিশালের সিরাজুল আলম খান।
প্লাবন যেমন একটা পথ করে নেয়, প্রেমও সম্ভব একটা পথ পেয়েই যায়। প্রেম নিবেদনের একটি নিরাপদ পথ বের করলাম; যাতে গ্রাহ্য হলে ভালো; প্রত্যাখ্যাত হলেও রাজনৈতিক কর্মীর মান-ইজ্জত ধুলায় লুটোপুটি খাবার আশংকা আর থাকলো না। সেটি হচ্ছে, দেয়াল পত্রিকা বের করা। বরিশাল কলেজ চত্বরে সে সময় শত বছর বয়সী একটি তমাল গাছ ছিলো; বাংলার অধ্যাপক মোজাম্মেল স্যারের পরামর্শে দেয়াল পত্রিকার নাম হলো, তমাল। আমি স্বনির্বাচিত সম্পাদক। যে কারণে কবিতার আদলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমার একটি নিবেদন প্রকাশ করতে মোটেই বেগ পেতে হয়নি। যুবক বয়সে কিশোর প্রেমের তাড়নার কথিত এ কবিতাটি বিবেচনায় না নিলে, দেয়াল পত্রিকাটি ছিলো সে সময়ের বিচারে অসাধারণ। এ বিষয়ে মোজাম্মেল স্যার, নোমান স্যার ও রাব্বানী স্যার যে সাপোর্ট দিয়েছেন তা মুক্তবাজার অর্থনীতির আজকের দিনে পিতাও সন্তানকে দেয় কিনা সন্দেহ। দিলে কি আর মা-বাবার হন্তা ঐশীরা সৃষ্টি হয়!
দেয়াল পত্রিকা পড়তে তমাল তলায় শিক্ষার্থীদের ভীড় কেবল নয়, শিক্ষকরাও দাঁড়িছেন। দাঁড়িয়েছে আমার টার্গেও; যেটি ছিলো আমার লক্ষ্য করার প্রধান বিষয়। কিন্তু দিন পেরিয়ে যায়, যায় সপ্তাহাও, মাস যাবার পরও আমার টার্গেটের কোন ভাবান্তর দেখলাম না। কিছু দিন পর ভাবলাম, আধুনিক কবিতা আসলে সবাই বোঝে না! কিন্তু আমাকে তো বুঝাতেই হবে। এ পর্যায়ে কবিতা বাদ দিয়ে গল্পের আদলে নিবেদনকে মনে হলো মোক্ষম। কিন্তু দেয়াল পত্রিকায় তো গল্প প্রকাশের সুযোগ কম। আর প্রভাব খাটিয়ে প্রকাশ করলেও আমার টার্গেট অনেক সময় নিয়ে যে সেটি পড়বে তারই বা নিশ্চয়তা কী? কাজেই এক সংখ্যা প্রকাশের পর তমাল নামক দেয়াল পত্রিকাটি মরে গেলো। বছর কয়েক আগে শত বছর বয়সী তমাল গাছটিও হাওয়া হয়ে গেছে। একি প্রাকৃতিক মৃত্যু, নাকি ইট-পাথরের উন্নয়নে বলিদান, তা জানি না। খোঁজ নেবার চেষ্টাও করিনি। কারণ মৃত্যু এতোই বেদনার, সেটি কীভাবে হলো তার খোঁজ নিতে গেলে কেবল কষ্টই বাড়ে। আবার তা যদি হয় খুন, তবে তো আর কথাই নেই।
বরিশাল জেলা পরিষদের অর্থায়নে একটি পত্রিকা প্রকাশ হতো, পাক্ষিক বাকেরগঞ্জ পরিক্রমা। রয়োজ্যেষ্ঠ সম্পাদকের নাম ভুলে গেছি, সম্ভত ইয়াকুব; এ পত্রিকার সঙ্গে মোজাম্মেল স্যার জড়িত ছিলেন। তার মাধ্যমে আমি যুক্ত হলাম। আমার সঙ্গে ছিলো সহপাঠি ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু জালাল। আর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু সরোয়ার দেয়াল পত্রিকায় যুক্ত হলেও বেশি দিন থাকেনি পাক্ষিক বাকেরগঞ্জ পরিক্রমায়। অনর্থক কাজে বেশি দিন না থাকার প্রবণতার কারণেই এক যুগ জাপানে থেকে দেশে ফিরে কোটিপতি বন্ধুটি অনেকটাই অবসর জীবন কাটাচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরে। দেয়াল পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে ছাত্রলীগের মনোনয়ন পেতে বেগ পেতে হয়নি সরোয়ারকে, নির্বাচিতও হয়েছিলো। তার ভোট ব্যাংক ছিলো মেয়েরা, সুদর্শন হবার কতই না সুবিধা! মেধাবী এই বন্ধুটি ব্যক্তি জীবন ম্যানেজ করার ক্ষেত্রেও দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে, সূর্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবী শীতল হবার একটি সূত্র তার ব্রিফ অনুসারে আমিও মাঝে মধ্যে কাজে লাগাই পারিবারিক জীবনে। এর সঙ্গে আছে আর এক বন্ধু নাসিরুজ্জামানের অমোঘ বাণী।
পাক্ষিক বাকেরগঞ্জ পরিক্রমার সঙ্গে আমরা অনেককে জড়িত করেছিলাম। মোজাম্মেল স্যারের আস্কারায় এ পত্রিকায় গল্প আকারে আমার একাধিক নিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এ নিবেদন টার্গেটে পৌঁছানোর জন্য কলেজ ক্যাম্পাসে পুস সেলের ব্যবস্থা করেছি। এ সূত্র ধরে সে সময় বরিশাল শহরে লেখক হিসেবে ছোটখাটো একটি পরিচিতিও হয়েছিলো। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচিতি ডিঙ্গানো যায়নি। এদিকে টার্গেট কোনো রকম প্রতিক্রিয়া না দেখানোতে “এবার ফিরাও মোরে” বলে আবার আমি রাজনীতিতে ফুল টাইমার হয়ে গেলাম। বিবাহিত জীবন ছাড়া এক কেন্দ্রে একটানা অনেক দিন আবর্তিত হবার রেকর্ড আমার খুব একটা নেই।
কলেজ ক্যাম্পাসে পত্রিকা পুস সেল করার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা ছিলো দৈনিক ইত্তেফাক। শুনেছি, শুরুতে সাংবাদিকরাও ইত্তেফাক পুস সেল করেছেন। ২০ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের মিডিয়া কমপ্লেস্ক উদ্বোধনকালে প্রধান মন্ত্রী শেখ হামিসনার ভাষণে জেনেছি, ইত্তেফাকের এ প্রক্রিয়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও যুক্ত ছিলেন। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বিভ্রান্ত রাজনীতি এবং না বলা প্রেমের আবর্তে বরিশালের শেষ দুই বছর কেটেগেলা। দুটোতেই প্রাপ্তি অশ্বডিম্ব!
ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষা শেষে অনেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো, আমার টার্গেটও। মাস তিনেক পর ফল প্রকাশের সময় গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা ইঁদুর ছানার মতো অমরা আবার সমবেত কলেজ ক্যাম্পাসে। কিবিল ভরের মধ্যেও দেখলাম, আমার টার্গেট আগের চেয়ে অনেক মোহনীয়। মনে সাহস সঞ্চয় করলাম! সিদ্ধান্ত নিলাম, সিনেমার মতো আজ বলবো; বলবোই বলবো..! যেহেতু সিদ্ধান্ত ছিলো, বরিশাল ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি দেবার, সেহেতু রাজনৈতিক ইজ্জত পাংচার হবার সংকোচ ঝেড়ে ফেলার সাহস সঞ্চয় করলাম। রেজাল্ট জানতে কলেজ ক্যাম্পাসে আসা আমার অস্বীকৃত প্রেমিকার সঙ্গে চোখাচুখি হতেই আমাকে জমিন থেকে আসমানে তোলার মতো অবাক করে দিয়ে অতি অমায়িক ভঙ্গিতে এগিয়ে এলো। সাধারণ কুশল বিনিময়ের পর সুদর্শন এক যুবককে পরিচয় করিয়ে দিলো। পুরোটা শোনার আগেই ভাবলাম, এই রকম একটি মদনকে যিশুর সিস্টার বিয়ে করলো!
অধিকতর রাজনীতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আকাংখ্যা নিয়ে ঢাকায় আসি ১৯৭৯ সালে, এটিই আমার প্রথম ঢাকা দর্শন। অব্যক্ত প্রেমের অপমৃত্যুতে তখন আমি কিছুটা মূহ্যমান। সে সময় মেধাবীর সংখ্যা আজকের তুলনায় কম ছিলো। ফলে একমাত্র টার্গেট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু বেগ পেতে হলো সমাজতন্ত্রের রাজনীতিতে টিকে থাকার ক্ষেত্রে। কারণ, জাসদ ছাত্রলীগে ভাঙ্গনের কারণে সমাজতন্ত্রের রাজনীতিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। একই কারণে পরবর্তীতে, সম্ভবত ১৯৯৩ সালে, নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হবার পরও ঢাকা সংবাদিক ইউনিয়নে আগ্রহ হারিয়েছিলাম।14690925_1792144454397282_1411779232862400765_n
রাজনীতিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় আমার হাতে চলে এলো অফুরান সময়। এ অবস্থায় বুলু ভাই’র মতো সাংবাদিক হবার ইচ্ছা মনের গহিনে উকি দিলো। বিষয়টি বলায় আমাকে অবাক কওে দিয়ে তিনি একবাক্যে রাজি হয়ে গেলেন। যদিও, বরিশালে বসে তার ঢাকার সাপ্তাহিক মতামতে আমার গল্প ছাপার অনুরোধ করায় তিনি এমন ভাবে তাকিয়েছিলেন, যেনো দিনের আকাশে জ্বলজ্বলে তারা দেখছেন! অনেক অনুনয় বিনয় করায় আমার লেখা গল্পের স্ক্রিপ্ট খুবই দয়াপরবশ হবার ভাব করে তিনি ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন। এবং মাস কয়েক পর পত্রিকার পাতা ভরাবার জন্য ম্যাটার টান পড়ায় তিনি আমার লেখা ছেপেও ছিলেন। সেই গল্প সম্পাদনা করতে গিয়েই সম্ভবত তার ধারণা হয়েছিলো, ছোট ভাইকে যতটা গাড়ল ভাবেন আসলে ততটা নয়। ফলে পত্রিকায় আমাকে চাকুরি দেবার প্রস্তাবে তিনি বিনা বাক্যব্যয়ে রাজি হয়েছিলেন। বুলু ভাই আমাকে নিয়ে গেলেন সাপ্তাহিত মতামতে। কিন্তু সাংবাদিকতার প্রথম টার্গেট বিফলে গেছে, কলেজ জীবনের প্রেমের মাঠে মারা যাবার মতো।  (চলবে)

-আলম রায়হান (প্রধান বার্তা সম্পাদক, মাইটিভি)।

 

অতি সাধারণ এক সাংবাদিকের কথা-১ Reviewed by on . প্রকৃত অর্থে সাংবাদিক হতে পেরেছি কিনা জানি না, তবে ১৯৮০ সাল থেকে এ পেশায় আছি বিভিন্ন মাত্রায়। যাত্রা শুরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাস্ট ইয়ারে থাকাকালে। মাধ্যম শ্রদ্ধেয় ব প্রকৃত অর্থে সাংবাদিক হতে পেরেছি কিনা জানি না, তবে ১৯৮০ সাল থেকে এ পেশায় আছি বিভিন্ন মাত্রায়। যাত্রা শুরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাস্ট ইয়ারে থাকাকালে। মাধ্যম শ্রদ্ধেয় ব Rating: 0

আপনার মন্তব্য দিন

scroll to top