Monday , 23 October 2017

মফস্বল সাংবাদিকতা ও কিছু কথা

January 31, 2016 4:26 pm Leave a comment A+ / A-

a16

মো.জিল্লুর রহমান রানা ::

নগরে ছুটছে সব। গ্রামের দরিদ্র মানুষ টাকা কামানোর তাগাদায়, কলেজ পাশ করে শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আশায়, ভালো চিকিৎসার জন্য অসুস্থ রোগী! এভাবে সমুদয় সেবাকাঠামোগুলো বন্দি হচ্ছে আমাদের ঝলমলে নগরীতে। আর পাঁচটা ব্যবসা, কাঁচামালের গদি, শিক্ষাকে বেঁচবার জন্য বহুতল ভবনে নির্মিত তথাকথিত ‘বিশ্ববিদ্যালয়’, টাকা ওয়ালাদের সর্বাধুনিক সেবা সরবরাহের জন্য চিকিৎসাকেন্দ্রের মতো আমাদের সাংবাদিকতা শিল্পও আজ রাজধানীর ঘেরে বন্দি। ‘অবিরাম বাংলার মুখ’র ভেতর যে কত বিরাম চিহ্ন! সংবাদপত্রের মোটা হরফের শিরোনাম কিংবা টিভি সংবাদের জমকালো আয়োজনের সংবাদজুড়ে রাজধানী আর ক্ষমতা কাঠামোরই প্রবল প্রতাপ। টেলিভিশনে প্রকাশিত রিপোর্টগুলোর বেশিরভাগই যেন রাজনীতি নামক মাঠের ফুটবল। প্রথম সংবাদটা যদি সরকারি দলের পায়ে তো পরের সংবাদটা বিরোধী দলের জালে। আর মাঝে সাঝে ভেতরের-উপরের পাতায় যে সব সংবাদ আসে, সে যেন আর দশটা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়িত্ব পালনের মতো আনুষ্ঠানিক কাজ আর ভাবমূর্তি নির্মাণ ও রক্ষার সফর। পত্রিকার বেশিরভাগ পাঠক শহুরে শিক্ষিত মানুষ। বিজ্ঞাপন আর পণ্যের বড় ভোক্তাও তারাই। তাই সংবাদপত্র বা টেলিভিশনের হর্তাকর্তারা শব্দ আর সময়ের স্পেস নিয়ে ভাবতে বসলে প্রথম বিজ্ঞাপন দাতাদের কথা ভাবেন। পাঠকের মাথা না বেঁচলে তো বাজারে টেকা যাবে না। তাই গোটা রাজধানী আর ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে থাকা ব্যাক্তি ও বিষয়গুলোর জন্য রঙিন চকচকে পাতা, অন্যপিঠে দেশজুড়ে’র একপাতায় দেশের আশিভাগ মানুষের ম্যাড়ম্যাড়ে মাঝের পৃষ্ঠার সংবাদ। সংবাদকে আমরা ভাগ ভাগ করে নিয়েছি, শহর আর গ্রামের ভৌগলিক ভাগবাটোয়ারার মতো। দেশ আর জনপদের খবর মানে মাঝের নির্ধারিত পৃষ্ঠা। অন্যদিকে রাজধানী, দেশের হর্তাকর্তা মানে পত্রিকার এপিঠ-ওপিঠ, সংবাদের শেষ-শুরু। আমাদের সাংবাদিকতা শিল্পে সংবাদকর্মীদের মধ্যেও রাজধানীর সাথে বাইরের এমন বিভাজন আছে যেটাকে কোনো কারনেই কেবলমাত্র স্থানিক দূরত্বের কারণে সৃষ্ট নাম বিভাজনের ফ্রেমে বন্দি রাখার উপক্রম নেই । সম্পর্কটা খানিকটা ব্রাহ্মণ-শূদ্রের মতো। ঢাকায় কাজ করি, তাই আমি বড় সাংবাদিক, অন্যদিকে যেহেতু তুমি গ্রামে থেকে সংবাদ পাঠাও, তাই তুমি লেজযুক্ত সাংবাদিক তথা মফস্বল সাংবাদিক। আমার ওয়েজবোর্ড, তোমার মাঝে-মধ্যে শব্দগুণে টাকা। আমার গলায় বড় করে প্রেস, তোমার পরিচয়পত্রের আবার দরকার কি!
সংবাদমাধ্যমকে একটি দেশের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। আর সংবাদমাধ্যমের কারিগর অর্থাৎ সাংবাদিকদের বলা হয় জাতির বিবেক। চিত্রে চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদপত্র হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্রের মূল সমন্বয়ক। সংবাদপত্রেই চিত্রিত হয় সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঠিক দিকনির্দেশনা। স্বল্প সময়ের কর্ম জীবনে কিঞ্চিতসম সাংবাদিকতা চর্চা থেকে এটা আমার উপলদ্ধি। তবে শ্রদ্ধেয় অগ্রজদের ভাষ্য মতে, সাংবাদিকতার সেই গৌরবময় প্রভাব বর্তমানে ম্লান হয়ে পড়েছে। নানা সমস্যার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আসছে সাংবাদিকতার প্রাণখ্যাত মফস্বল সাংবাদিকতা।
পাবনা জেলার সবচেয়ে অবহেলিত উপজেলা আটঘরিয়া। ১৮৬.১৫ বর্গ কি.মিটার আয়তনের এই উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৫ সালে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে রয়েছে চরম অবহেলিত। যে উপজেলায় চরম সম্ভাবনা থাকা সত্বেও আজ পর্যন্ত সরকারি বা বে-সরকারি উদ্যেগে গড়ে উঠেনি কোনপ্রকার শিল্প, মিলফ্যাক্টরি, ইন্ডাষ্ট্রি, কারখানা। সেই উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হিসাবে ৯০ দশকের শেষভাগে এসে সাংবাদিকতা শুরু করি। যখন পাবনা জেলায় গুটি কয়েক সাপ্তাহিক ও দৈনিক পত্রিকা বিদ্যামান ছিল। আস্তে আস্তে সাংবাদিকতার প্রায় ১ যুগ পেরিয়ে যেতে লাগল কিন্তু উপজেলা সকল সেক্টরের মতই সাংবাদিকতাতেও দেখতে এবং উপলব্ধি করতে লাগলাম অবহেলার সেই রুপ। এমনিতেই উপজেলায় উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিদ্বয় সাংবাদিকতায় আসতে নারাজ তার উপর আবার সেই অবহেলার কাল ছায়া। দেশে বর্তমানে প্রায় অর্ধশত প্রথম সারির দৈনিক পত্রিকা রয়েছে যার একটিতেও কোন প্রকার প্রতিনিধি বা সংবাদদাতা নেই। তাই বলে এই নয় সেই সকল পত্রিকায় কাজ করার মত মেধাসম্পন্ন মানুষ নেই। আমি কোন এক শীর্ষ জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকের সাথে কথা বলে ছিলাম আমাকে উক্ত পত্রিকায় স্থানী প্রতিনিধি দেয়ার ব্যপারে। বিনিময়ে তিনি আমাকে জানালেন ওই ধরনের লোকাল উপজেলায় আমরা কোন প্রকার প্রতিনিধি দেইনা। আমি আরও বিস্মিত হয়ে গেলাম। শীর্ষ পত্রিকায় দেশের কোন উপজেলাতে প্রতিনিধি নেই তা নয়। আমাদের জেলা প্রতিনিধিরাও চাননা আটঘরিয়াতে কোন প্রতিনিধি হোক। তাদের সুপারিশেই অবশ্য সংবাদপত্রগুলো উপজেলা প্রতিনিধি দিয়ে থাকেন। আমার বিশ্বাস সেই সকল জেলা প্রতিনিধিদের বছরের পর বছর তোয়াজ ও তেল মারলে এটা সম্ভব। তবে নিরাশ হবারও কিছু নেই নানা প্রতিকুলতার মাঝেও নিজের চেষ্টাতেই উপজেলার কিছু কিছু প্রতিভাবান সাংবাদিকরা টিভি সাংবাদিকতা ও দ্বিতীয় সারির দৈনিকে জেলা প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করছেন। সাংবাদিকতার প্রাণখ্যাত মফস্বল সাংবাদিকতা, কথা যেমন সত্য তেমনি সাংবাদিকতায় উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ করে এর পরিধিকে আরও প্রসিদ্ধ করতে হবে।
বর্তমানে শুধু আমাদের উপজেলাতেই নয় বাংলাদেশের অনেক উপজেলা এবং জেলা গুলোতে স্বল্প শিক্ষিত লোক এ পেশায় নিয়োজিত হচ্ছেন অসৎ উদ্দেশ্যকে চরিতার্থ করতে। অনায়সে বলা যায়, বর্তমানে মফস্বল সাংবাদিকতা ধ্বংসের শেষ সীমানায় পৌঁছেছে। অনেক গেছে এখন থামানো দরকার। সব ঝড় থামিয়ে ফিরে আনতে হবে গৌরবময় ঐতিহ্য। এ জন্য প্রয়োজন জাতির বিবেকদের ইস্পাত কঠিন ঐক্য। সাংবাদিক নেতাদের উচিত এখনই উদ্যোগ নেওয়া। মহান পেশাকে পুনর্জীবিত করতে হলে সেইসব ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকতে এ পেশায় আসছেনা আনেক উচ্চ শিক্ষিত মানুষ। কিন্তু তাই বলে আমিতো আমার জন্মভূমিকে অজানা উদ্দেশ্য ছেড়ে দিতে পারিনা। উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা এ মহান পেশায় যখন আসতে নারাজ তখন এর সুযোগ নিচ্ছে স্বার্থন্বেষী মহল। আমি জানি উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিকতা করে জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব নয়। আমাদের স্কুল, কলেজ শিক্ষকরা একটু সদিচ্ছা পোষণ করলেই এ পেশাটাকে আরও সমাদ্রিত করতে পারেন।
দেশের বিদ্যমান মফস্বল সাংবাদিকতা গ্রামীণ সংবাদ সরবরাহের ক্ষেত্রে সেতুর কাজটি করতে পারছে না বা তাকে দিয়ে কাজটি করানো হচ্ছে না। উপরšুÍ দেশের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কেন্দ্র্রনির্ভর সাংবাদিকতার যে বৃত্ত তার সাথে প্রাত্যহিক সমান্তরাল যে দূরুত্ব টিকে আছে, সেটা স্থির থাকার পাশাপাশি বাড়ছে নানামুখি সমস্যাও। বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতার বিভিন্নমূখী প্রবণতা ও বৈশিষ্ট্যসমূহ বোঝাসহ এর সাথে সম্পর্কিত কেন্দ্রসংশিষ্ট ফ্যাক্টরসমূহ চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে বর্তমান প্রবন্ধে দেশের প্রান্তে কর্মরত মফস্বল সাংবাদিকদের অভিমত ও অনূভুতি সমূহ উপস্থাপনের পাশাপাশি কেন্দ্রে কর্মরত সাংবাদিকের ভাষ্য উপস্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে মফস্বলে কর্মরত সাংবাদিকদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা সমূহ সম্পর্কে পাঠকের একটি স্পষ্ট ধারণা তৈরির পাশাপাশি বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতা সম্পর্কিত একটি রেখাচিত্র আঁকার সম্ভাবনা তৈরি হবে। নোয়াখালির সাংবাদিক ও কলাম লেখক গোলাম মহিউদ্দিন নসু তার মফস্বল সাংবাদিকতা শীর্ষক প্রবন্ধে মফস্বল সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পয়সা উপার্জনের বিভিন্নমুখি উপায়, মফস্বল সাংবাদিকতার সাম্প্রতিক প্রবণতাসমূহ সম্পর্কে আলোকপাত করে বলেন- ৫ম/ ৮ম শ্রেণি পাশের সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরি নিয়ে যে লোকটি পত্রিকা বিলি করতো অথবা বিজ্ঞাপন খুজঁতো, তার পকেটে উপজেলা, জেলা বা বিশেষ প্রতিনিধির কার্ড। ইংরেজীতে নিজের ঠিকানাটা ভাল ভাবে লিখতে যার কষ্ট হবে, সেও ঢাকার ইংরেজি কাগজের প্রতিনিধির পরিচয় দিচ্ছে। পত্রিকা বিলি কারক, বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি, সংবাদদাতা, প্রতিনিধি, প্রতিবেদক সবই ঐ একজন মফস্বল সাংবাদিক। এক্ষেত্রে পত্রিকার কোন কোন সম্পাদকরা এ সূযোগে কার্ড ব্যবসা করেন। আবার মান মূল্যায়ন না করে ফ্যক্টরি মালিকের মতো অনেকটা বিনে পয়সায় খাঁটিয়ে নেয়।
অনলাইনে মফস্বল সাংবাদিকতার বিকাশের যে ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে, এর পাশাপাশি সিটিজেন ও কমিউনিটি সাংবাদিকতার ছোট ছোট প্রবণতা আমাদেরকে নতুন দিনের দিকে চোখ ফেরাতে বলে। যেখানে পাঠকরা কেবল কেন্দ্র নির্ভর মিডিয়া ভোক্তা না হয়ে নিজেরাই মিডিয়া তৈরি করছে। বিশ্বপরিসরে নিজেদের অভাব অভিযোগ তুলে ধরছে নিজস্ব ভঙ্গিতে। তাই আমাদের মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার উচিত হবে মফস্বল সাংবাদিকতার যে বিশাল সম্ভবনা সেটাকে বোঝা। মফস্বল সাংবাদিককে গুরুত্বহীন না ভেবে বরং মফস্বল সংবাদদাতাদের প্রতি শহরের সাংবাদিকদের মতোই সমান গুরুত্ব ও মর্যাদা দেয়া। দেশের সামগ্রিক সাংবাদিকতা চর্চার ক্ষেত্রটিকে আরো কার্যকর ও জনমখী করে তোলা।

মফস্বল সাংবাদিকতা ও কিছু কথা Reviewed by on . মো.জিল্লুর রহমান রানা :: নগরে ছুটছে সব। গ্রামের দরিদ্র মানুষ টাকা কামানোর তাগাদায়, কলেজ পাশ করে শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আশায়, ভালো চিকিৎসার জন্য অসুস্থ মো.জিল্লুর রহমান রানা :: নগরে ছুটছে সব। গ্রামের দরিদ্র মানুষ টাকা কামানোর তাগাদায়, কলেজ পাশ করে শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আশায়, ভালো চিকিৎসার জন্য অসুস্থ Rating: 0

আপনার মন্তব্য দিন

scroll to top