Friday , 19 January 2018

সংবাদ শিরোনাম

অতি সাধারণ এক সাংবাদিকের কথা-২

December 10, 2016 2:25 pm Leave a comment A+ / A-

1504109_1466604310284633_2296187361015739784_nসাপ্তাহিক মতামতের অফিস ছিলো দৈনিকবাংলা ভবনের পাশে। মালিক-সম্পাদক এস এম ফখরুদ্দিন, ঝালকাঠি জেলার মানুষ। সে সময় সাপ্তাহিক মতামতে বুলু ভাই ছাড়াও কাজ করতেন আলম মেহেদী ও মাহবুব কবীর। আলম মেহেদী দৈনিক দেশ-এ দীর্ঘ সময় কাজ করার পর সে এখন পেশায় ব্যাংকার; মাহবুব কবীর এখনো আছেন সংবাদিকতায়।
সকাল ১১টার দিকে বুলু ভাই’র সঙ্গে মাতামত অফিসে গেলাম। মনের ভিতর অন্যরকম দোলা, ফুরফুরা ভাব; সেপ্টেম্বর এইজে প্রেম করার মতো। বরিশালে বসে যে পত্রিকা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি সেই পত্রিকায় কাজ করবো- সে এক বিশেষ অনুভূতি, কিশোর প্রেমের মতো! মহসীন হল থেকে দৈনিকবাংলা পর্যন্ত রিকসায় সর্বোচ্চ ২০ মিনিটের পথ। কিন্তু এ পথ পাড় হতেই ২০ বছরের ছেলেমানুষি পরিকল্পনা করে ফেললাম। এ ক্ষেত্রে ফাউন্ডেশন ছিলো বরিশালের পাক্ষিক বাকেরগঞ্জ পরিক্রমা। পাক্ষিক এ পত্রিকায় আমার প্রথম রিপোর্ট ছিলো, শহরের কেন্দ্র স্থলে সুপার মার্কেট তৈরীর জন্য মাটি খুঁড়ে ফেলার পর বছরের পর বছর ফেলে রাখার বিষয়টি। এতে পানি জমে পুকুরের মতো হয়ে গেছে। মোজাম্মেল স্যার এ রিপোর্টের শিরোনাম করেছিলেন, সুপার পুকুর! বেশ আলোচিত হয়েছিলো এ রিপোর্টটি। সাধারণ একটি আইটেও যে চৌকস শিরোনামের কারণে বিশেষ উচ্চতায় পৌঁছতে পারে সে বিষয়টি অনুভব করেছি ১৯৭৮ সালেই। এখনো আলোচিত হয়, দৈনিক ইত্তেফাকের একটি শিরোনাম। এক ইউপি সদস্যকে গরু তাড়া করার ঘটনার খবরের শিরোনাম ছিলো, চিনিলো কিভাবে!
আগে থেকে মতামত সম্পাদক ফখরুদ্দিন সাহেব অফিসে ছিলেন। সুন্দর গুছানো অফিস। লম্বা কক্ষের দুই ধারে টেবিল চেয়ার, মাঝখান দিয়ে চলার পথ; শেষ মাথায় সম্পাদকের রুম। ছোট, কিন্তু বেশ গুছানো। বুলু ভাই সম্পাদকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন, জানালেন আমার বাসনার কথাও। সম্ভবত আগে থেকে ধারণা দিয়ে রেখেছিলেন। সম্পাদক সাহেব আমাকে খুবই আন্তরিকভাবে গ্রহণ করলেন। গ্রামের খবর থেকে শুরু করে লেখাপড়াসহ সকল খবর নিলেন। বললেন আর যাই করো, লেখা-পড়া ছাড়বা না। সে অনেক কথা! অনেক প্রত্যাশার আলো দেখালেন তিনি, সেই আলোর জ্যোতি ছিলো জাসদের মশালের চেয়েও জ্বলজ্বলে। তার কথাবার্তা ও আচরণে আমি মুগ্ধ। কিন্তু তখনও জানিনা জাসদের মশালের মতো মতামত সম্পাদকের আলোও আমাকে হতাশ করবে!
ঘণ্টা খানেক অনেক কথার পর মতামত সম্পাদক বললেন, ঠিক আছে আলম; আলহামদুলিল্লাহ, কাজ শুরু করে দাও; তবে শোন, ভাই, তোমোকে কিন্তু কোন টাকা-পয়সা দিতে পারবো না। তার এ কথায় কানের উপর শক্ত হাতের চপেটাঘাতে ইচ্ছা-মাতালের নেশা কেটে যাবার মতো অবস্থা হলো আমার। এরপরও বিনয়ের সঙ্গে বললাম, তা হলে আমি আপনার পত্রিকায় কাজ করবো কেন!
: কেন, তুমি আমার এক্সপার্টদের সঙ্গে থেকে কাজ শিখবা।
তার এই বয়ান শুনে চাকুরি প্রত্যাশার বিনয় বেশ কিছুটা উবে গেলো। শক্ত গলায় বললাম, আপনার যে এক্সপার্ট সে আমার আপন খালাতো ভাই, এখন তার সঙ্গে ইউনিভার্সিটির হলে এক রুমে থাকি। তার কাছে কাজ শিখতে আপনার পত্রিকায় মাগনা খাটতে হবে কেন!
খুবই ন্যায্য কথা। এ প্রশ্নে জবাব ছিলো না সম্পাদক সাহেবের কাছে। পরে শুনেছি, আমি চলে আসার পর মাননীয় সম্পাদক সাহেব বুলু ভাইকে বলেছেন, রেজা তোর ভাইটা খুব বেয়াদব।
এখানেই মতামত সম্পাদক প্রসঙ্গ শেষ হওয়া স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু তা হয়নি। বছরখানেক পর তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, কথাও হয়েছে।
সে সময় ডিএফপি’র কাছে পত্রিকার মালিকরা অনেকটাই জিম্মি ছিলেন, এখনও কমবেশি আছেন; এ ক্ষেত্রে আন্ডারগ্রাউ- থেকে বহুল প্রচারিত, সকলের অবস্থাই তথৈবচ। প্রচার সংখ্যার উপর নির্ধারণ হয় পত্রিকার বিজ্ঞাপন মূল্য হার; এ প্রচার সংখ্যা নির্ধারণ করে ডিএফপি এবং বিজ্ঞাপন দেয়ার সোল এজন্টও ছিলো তথ্যমন্ত্রণালয়ের অধীন দুর্নীতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত এ সংস্থাটি। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার দুর্নীতি প্রসঙ্গ নিয়ে বারবার আলোচনা হলেও এ সংস্থাটির বিষয় তেমন আলোচনায় আসেনি কখনো। কারণ, যারা আলোচনায় আনবে সেই জাতির বিবেক সংবাদ পত্রের প্রাণ ভোমরা এখনো এ সংস্থার হাতে। এটি পুঁজি করে পত্রিকাগুলোর কাছ থেকে লাগাতার ঘুষ নিয়ে এ সংস্থার সুইপার থেকে সর্বোচ্চ পদ পর্যন্ত অনেকেই কোটিপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, এখনো এই ধারা কিছুটা বজায় আছে বলে শুনেছি। সে সময় আলোচিত এক কর্মকর্তা প্রধান তথ্য কর্মকর্তাও হয়েছিলেন এবং এ পদ থেকেই অবসরে গেছেন।
১৯৮০ সালে ডিএফপির কোটিপতি পরিচিতির বাইরে গুটি কয়েক যারা ছিলেন তাদের মধ্যে একজন আবদুর রশিদ খলিফা। এ কর্মকর্তার দায়িত্ব ছিলো ছাপাখানায় গিয়ে পত্রিকার ছাপার সংখ্যা সম্পর্কে রিপোর্ট দেয়া। তখন অনেকেই অবাক হতেন, রশিদ খলিফার মতো সৎ ও শক্ত কর্মকর্তা কিভাবে থাকেন ডিএফপি’র গুরুত্বপূর্ণ এ পদে! কিন্তু আনেকেই যা জানতো না, রশিদ খলিফার রিপোর্ট উপরে গিয়ে ফাইলে পাল্টে যেতো; শূন্যের কারসাজিতে ৫০০ হয়েযেতো ৫০০০, ১৫০০০ হলেই বা মারে কে! তবে বিনিময়ে দিতে হতো মোটা অংকের উৎকোচ; এখনো সরকারী কাগজপত্রের হিসেবে অনেক পত্রিকার প্রচার সংখ্যা কয়েক হাজার হলেও বাস্তবে দুইএক শতের বেশী ছাপা হয় না এসব পত্রিকা। আর কুমিরের ছানার হিসেব মিলানোর মতো বহাল আছে আগের রেওয়াজ।
সাপ্তাহিক জনকথায় থাকাকালে তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় ঘটনাচক্রে। বরিশালের ছেলে ও ইউনির্ভাসিটির ছাত্র বলে তিনি আমাকে শুরু থেকেই পছন্দ করতেন। এক দিন কথায় কথায় তার এক প্রতিবেশীর অত্যাচারের কথা জানালেন। কিন্ত এ বিষয়ে তিনি পত্রিকায় রিপোর্ট করাতেও পারছেন না; কারণ তা হলে তার কাছে ফেবার দাবি করার আশংকা ছিলো এখরোখা এই মানুষটির। আমি বিষয়টি নিয়ে জনকথা সম্পাদক ইব্রাহিম ভাইর (ইব্রাহিম রহমান) সঙ্গে কথা বললাম। তিনি বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে; একটা আইটেম করে দাও।
রশিদ খলিফার ঢাকার বাড়ি ছিলো গোড়ান এলাকায়, জীবনের সকল সঞ্চয় ব্যয় করে শান্তির নীড় গড়তে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বাড়ি করার অশান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়ে এক রকম নরকের অবস্থা সৃষ্টি করেছিলেন রশিদ ইঞ্জিনিয়ার নামে এক প্রতিবেশী, সেও ছিলেন বরিশালের লোক। দুর্নীতির দায়ে চাকুির হারানো এ ব্যক্তি অনেক নগদ অর্থ ও সম্পদের মালিক ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে সাপ্তাহিক জনকথায় রিপোর্ট প্রকাশের পর জোকের মুখে নুন পড়ার মতো গুটিয়ে গেলেন মহা দাপুটে ব্যাক্তি রশিদ ইঞ্জিনিয়ার; আর রশিদ খলিফা ধরেই নিয়েছিলেন, আমার চেয়ে বড় সাংবাদিক বাংলাদেশে তো দূরের কথা, পৃথিবীতেই নেই! হয়তো এ ভ্রান্তিতে প্রভাবিত হয়ে তার অফিসে গেলে আমার বাবার বয়সী হওয়া হত্ত্বেও তিনি আমাকে দাঁড়িয়ে রিসিভ করতেন। বিষয়টি আমার বয়সের সঙ্গে যায় না- তাকে বারবার বলা সত্ত্বেও তিনি শুনতেন না। তার বক্তব্য হলো, তিনি কোন ব্যক্তিকে নয়; একজন সৎ সাংবাদিকে সম্মান জনাচ্ছেন; সে ছেলের বয়সী হোক আর যাই হোক ।
এই রশিদ খলিফর সঙ্গে একদিন আমি গল্প করছিলাম তার অফিসে। ফাঁকে ফাঁকে তিনি অফিসের কিছু কাজও সারছিলেন। এ অবস্থায় একজন লোক এসে দাঁড়ালো। সালামও দিলো রশিদ খলিফাকে; সালাম নিলেও বসতে বললেন না। কণ্ঠ শুনে না তাকিয়েই তাকে চিনেফেলেছিলাম। কিন্তু এমন একটা ভাব করলাম, যেনো তাকে খেয়াল করিনি। তবু তিনি দাঁড়িয়ে থাকলেন। রশিদ খলিফা আমার সঙ্গে গল্প করছেন। এর মধ্যে গরম সিঙ্গারা এলো, স্বভাবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সিঙ্গারায় অধিকতর মনোনিবেশ করার ভাব করলাম, অথচ আমি সিঙ্গারা এবং এ জাতীয় খাবার এডিয়ে চলি। কিন্তু সেদিন সিঙ্গারা নিয়ে এমনভাবে ব্যস্থ হলাম যেনো টাঙ্গাইলের চমচম খাচ্ছি। অনুভব করলাম, লোকটা তখনও দাঁড়িয়ে আছেন; কিন্তু রশিদ খলিফা তাকে মোটেই আমলে নিচ্ছেন না। মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে থাকার পর তিনি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে আদূরে গলায় বললেন, তুই রেজার ভাই না! আমি প্রফেশনাল কন্ঠে বললাম, হ্যা; বড় ভাই, (আসলে আমি ছোট ভাই)। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তুই থেকে আপনেতে উঠে গিয়ে বললেন, আপনে এখন কোথায় আছেন। বলতে পারতাম, 14900390_1794125040865890_152439669192819719_nজনকথায়; যা আমার মজ্জাগত বৈশিষ্ট। কিন্তু স্বভাবগত বিনয়ের বিপরীতে গিয়ে বললাম, জনকথার নিউজ এডিটর। তিনি আর কথা বাড়ালেন না। নীরবে চলে গেলেন। এই লোকটিই ফখরুদ্দিন সাহেব, সাপ্তাহিক মতামতের সম্পাদক; যার কাছে প্রথমে চাকুরীর কথা বলে বিফল হয়েছিলাম, কলেজ জীবনে না বলা প্রেমের মতো!  (চলবে)          

   -আলম রায়হান (প্রধান বার্তা সম্পাদক, মাইটিভি)।

অতি সাধারণ এক সাংবাদিকের কথা-২ Reviewed by on . সাপ্তাহিক মতামতের অফিস ছিলো দৈনিকবাংলা ভবনের পাশে। মালিক-সম্পাদক এস এম ফখরুদ্দিন, ঝালকাঠি জেলার মানুষ। সে সময় সাপ্তাহিক মতামতে বুলু ভাই ছাড়াও কাজ করতেন আলম মেহে সাপ্তাহিক মতামতের অফিস ছিলো দৈনিকবাংলা ভবনের পাশে। মালিক-সম্পাদক এস এম ফখরুদ্দিন, ঝালকাঠি জেলার মানুষ। সে সময় সাপ্তাহিক মতামতে বুলু ভাই ছাড়াও কাজ করতেন আলম মেহে Rating: 0

আপনার মন্তব্য দিন

scroll to top